Welcome to GSIS — Transforming Lives 24/7

You have any question? +88018123356

ওয়াকফ : এক হারানো ঐতিহ্যের সন্ধানে | শাহনেওয়াজ খান চন্দন

বিংশ শতাব্দির শুরুতে যখন কলকাতার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সমাজপতিরা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করছিলেন অনেকটা এই যুক্তিতে যে, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ববঙ্গের “ম্লেচ্ছ চাষা শ্রেণী” শিক্ষিত হয়ে যাবে, তাদের এই প্রবল শ্রেণীস্বার্থবাদি আগুনে পানি ঢেলে দিলেন পূর্ববঙ্গের নবাবেরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় ভবন প্রতিষ্ঠার ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ এবং তাঁর পরিবার দান করলেন ৬০০ একর জমি। এই ৬০০ একর জমির মধ্যে শাহবাগে নবাব পরিবারের বাগান বাড়ি এবং আরো বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির নবাব সৈয়দ নওয়াব আলি চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অর্থ সংগ্রহ করার জন্য তাঁর বিশাল ভূ-সম্পত্তির বিরাট একটি অংশ বন্ধক রাখলেন। তাঁদের এই অসামান্য বদান্যতার পেছনে মূল কারণ ছিল পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে—যাদের সিংহভাগই ছিল দরিদ্র মুসলিম কৃষক—শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা।

এই নবাবদের বদান্যতা এবং নিঃস্বার্থভাবে অর্থ এবং ভূ-সম্পত্তি দানের কারণেই আজকে বাংলাদেশ চারটি সর্বোচ্চ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পেয়েছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

মুসলিম অভিজাত শ্রেণী এবং ধনিকগোষ্ঠীর মধ্যে সমাজের কল্যাণার্থে দান করার যে একটি সংস্কৃতি ছিল, তার কারণেই বলতে গেলে আজ আমরা জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। কিন্তু আজ মুসলিম সমাজের সেই ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্তির পথে।

পূর্ববঙ্গের এই নবাবদের মত প্রত্যেক অভিজাত মুসলিম পরিবারে একসময় প্রথাই ছিল যে, তাঁদের সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পূর্ণ জনসাধারণের কল্যাণার্থে ব্যয় করা হবে। এই দান করার প্রথাকে বলা হয় ‘ওয়াকফ’ এবং দানকৃত সম্পত্তিকে বলা হয় ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’।

পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (স) এর বাণীর মাধ্যমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে সম্পদশালী মুসলিম পরিবারগুলো তাঁদের সম্পদের বড় একটি অংশ ধর্মীয়, শিক্ষামূলক এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য পুরোপুরি স্বত্ব ত্যাগ করে এবং কেবল পরকালে পূণ্যপ্রাপ্তির আশায় দান করে যেতেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি ঢাকা শহরেই ছড়িয়ে আছে বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি যা জনকল্যাণে বা ধর্মীয় কাজের উদ্দ্যেশ্যে দান করা হয়েছিল এবং এসব সম্পত্তি শুধুমাত্র জনকল্যাণেই বা ইসলামি কাজেই ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো দুর্নীতিবাজ প্রশাসন এবং সামাজিক অবহেলার কারণে এসব সম্পত্তি আজ ভূমিদস্যুদের পেটে গেছে এবং কোনটিই আর জনকল্যাণের কাজে বা ইসলামের কাজে আসছে না।

ঢাকায় অবস্থিত সবচেয়ে মূল্যবান ওয়াকফ সম্পত্তি হলো ‘আইনউদ্দিন হায়দার-ফয়জুন্নেসা ওয়াকফ এস্টেট’। ঢাকা মহানগরীর প্রায় ১২,৫০০ একর জমি এই এস্টেটের অন্তর্গত। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে একজন প্রভাবশালী মুসলিম ম্যাজিস্ট্রেট আইনউদ্দিন হায়দার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রায় পুরো সম্পত্তি (৮০০০ একর জমি) ইসলাম প্রচার এবং ইসলামি শিক্ষা প্রসারের জন্য দান করে যান। কিছুকাল পরে তাঁর স্ত্রী ফয়জুন্নেসা মৃত্যুর পূর্বে তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তিও (৪৫০০ একর জমি) একই উদ্দ্যেশ্যে ওয়াকফ করে যান। জানা যায় যে, আইনউদ্দিন হায়দার-ফয়জুন্নেসা দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন।

১৯১৩ সাকে Mussalman Waqf Validating Act, 1913 পাস হলে তৎকালীন ওয়াকফ বোর্ড এই মহতি দম্পতির দানকৃত পুরো ১২,৫০০ একর জমিকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধন করে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির কিছু আগে থেকেই এই বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি ধীরে ধীরে বেহাত হতে শুরু করে। বর্তমানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা যেমন- সচিবালয়, বঙ্গভবন, রেলওয়ের প্রধান কার্যালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয়, হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউট এই ওয়াকফ সম্পত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত বলে জানা যায়।

ওয়াকফ সম্পত্তি দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীনে ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয় বলে একটি সংস্থা আছে। বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী বেশিরভাগ ওয়াকফ সম্পত্তি ভারত বিভাগের পর জারিকৃত State Acquisition and Tenancy Act, 1950 আইনের বলে সরকার অধিগ্রহণ করে। এই আইনের বলে সরকার জমিদারদের কিছু জমি অধিগ্রহণ করে এবং কিছু জমি অধিগ্রহণের পরে আবার তা নাগরিকদের মধ্যে বন্দোবস্ত করে দেয়। আবার কিছু ওয়াকফ সম্পত্তির কাগজপত্র কলকাতা থেকে আর কখনোই আনা হয়নি, যা নিয়ে পরবর্তীতে জটিলতা শুরু হয়।

State Acquisition and Tenancy Act, 1950 এর বলে সরকার কেবল জমিদারদের ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূসম্পত্তিই অধিগ্রহণ করতে পারত। ওয়াকফকৃত বা দানকৃত কোন সম্পত্তি অধিগ্রহণ করার ক্ষমতা সরকারকে দেয়া হয়নি। কিন্তু বহু ওয়াকফ সম্পত্তির কাগজপত্র ভারতে থাকার কারণে সরকার সেসব জমি অধিগ্রহণ করে ফেলে। ওয়াকফ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬২ পাস হবার পর ওয়াকফ সম্পত্তির মোতাওয়াল্লিরা ওয়াকফ সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে মামলা করতে শুরু করেন। এমন কিছু মামলা এখনো ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন অবস্থায় আছে।

ইতিমধ্যে সরকার ভূমি জরিপ করেছে, ভূমি উন্নয়ন করেছে এবং বহু ভূমি নাগরিকদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করেছে। সেসব নাগরিকরা আবার তাঁদের উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তর করেছে বা অনেকের কাছে বিক্রয় করেছে। এখন ৪০-৫০ বছর পরে আদালত কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওয়াকফ এস্টেটের পক্ষে রায় দিলেও দুর্বল ওয়াকফ প্রশাসন বর্তমান দখলকারীদের পুনর্বাসন করে সম্পত্তির দখল নিতে পারছে না। ওয়াকফ প্রশাসন এসব সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে তাঁদের অক্ষমতার কথা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওয়াকফ প্রশাসন খান জাহান আলি’র মাজার সংলগ্ন সম্পত্তি দখলমুক্ত করার জন্য ১৯৬৪ সালে মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার নিষ্পত্তি হয় ২০১৩ সালে, দীর্ঘ ৪৯ বছর পরে এবং রায় ওয়াকফ প্রশাসনের পক্ষেই যায়।

কিন্তু ঢাকা মহানগরীর সর্ববৃহৎ ওয়াকফ সম্পত্তি আইনউদ্দিন-ফয়জুন্নেসা ওয়াকফ এস্টেট এর ১২,৫০০ একর সম্পত্তি নিয়ে মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয় নি। এই এস্টেট এর সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে প্রথম মামলা হয় ১৯৪৪ সালে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আরো বেশ কিছু মামলা হয় যা আজ অবধি অমীমাংসিত থেকে গেছে।

ভূমিদস্যুদের কবল থেকে ওয়াকফ সম্পত্তি দখলমুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন বর্তমানে হাইকোর্টেই ৪২১ টি মামলা লড়ছে। এছাড়া নিম্ন আদালতে ঝুলে আছে প্রায় ২০০০ মামলা। ওয়াকফ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান যে, যখনই তারা কোন ওয়াকফ সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে যান, তখনই স্থানীয় প্রভাবশালীরা দেওয়ানী মামলা ঠুকে দেন যা বছরের পর বছর চলতে থাকে। ফলে এসব জমি দখলমুক্ত করা তাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

এধরণের মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা এবং ওয়াকফ প্রশাসনের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের অচল আর্কাইভিং ব্যবস্থা। ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত দলিলপত্র, যেগুলোর বেশিরভাগই কয়েকশ বছরের প্রাচীন, নিতান্ত অবহেলার সাথে কার্যালয়ের স্টোররুমে পড়ে আছে। এসব দলিলের হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ ধংস হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক দলিলের লেখাই আর পাঠযোগ্য অবস্থায় নেই। প্রশাসন থেকে এসব দলিল বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ বা ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ নেই। আবার বহু সম্পত্তির দলিল এই স্টোররুম থেকে সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে গিয়েছে। এই জন্য ওয়াকফ প্রশাসনের পক্ষের আইনজীবিরা আদালতে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র অনেক সময়েই দাখিল করতে পারেন না এবং মামলার কাজ পরিচালনা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। আবার এভাবেই এসব দলিল যেগুলো ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যগতভাবেও আমাদের এক অমূল্য সম্পদ তা সম্পূর্ণ হারিয়ে যাচ্ছে আমলাতান্ত্রিক অবহেলা এবং দায়িত্বহীনতার কারণে।

Waqfs (Amendment) Act, 2013 অনুসারে ওয়াকফ সম্পত্তি তার মোতাওয়াল্লিদের পূর্ণ সম্মতি ব্যতিরেকে কোনভাবেই বিক্রয়, হস্তান্তর বা সম্পত্তির অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যাবে । যদি মোতাওয়াল্লিদের পূর্ণ সম্মতিক্রমেই ওয়াকফ সম্পত্তির হস্তান্তর বা তার অবস্থার পরিবর্তন করতে হয় তাহলে ১৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সেই কমিটির মাধ্যমে তা করতে হবে। ওয়াকফ প্রশাসক হবেন সেই কমিটির সভাপতি।

ওয়াকফ অধ্যাদেশ ১৯৬২ অনুযায়ী সরকার যদি কোন ওয়াকফ সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেই থাকে, তাহলে সরকারকে বর্তমান বাজারমূল্যে ওই সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করে নির্ধারিত মূল্যের তিনগুণ অর্থ অথবা ওই সম্পত্তির সমপরিমাণ এবং সমমূল্যের খাস জমি, যে উদ্দ্যেশ্যে উক্ত সম্পত্তি ওয়াকফ করা হয়েছিল ঠিক একই উদ্দ্যেশ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যয় করতে হবে।

ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে ওয়াকফ সম্পত্তির বেশিরভাগই ভূমি দস্যুদের পেটে গিয়েছে, সরকারি দখলে নয়। ওয়াকফ প্রশাসনের দুর্বলতা এবং দুর্নীতির সুযোগে এসব সম্পত্তির অসৎ মোতাওয়াল্লিরা গণহারে এসব জমি বিক্রয় করেছে এবং নিজেদের আখের গুছিয়েছে। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শাহজাদি বেগম ওয়াকফ এস্টেট যা গাজিপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং মুন্সিগঞ্জ জেলার ৭২,০০০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই বিশাল সম্পত্তির প্রায় পুরোটাই ভূমিদস্যুদের পেটে গিয়েছে।

শুধুমাত্র ঢাকা বিভাগেই ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয় ৮৫,০০০ একর ওয়াকফ সম্পত্তির উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগে ৬,৬৮৩ একর ওয়াকফ সম্পত্তি, রাজশাহী বিভাগে ২২,৯৪৭ একর ওয়াকফ সম্পত্তি, রংপুর বিভাগে ৬৭৪ একর ওয়াকফ সম্পত্তি, খুলনা বিভাগে ৭৫৫ একর, বরিশাল বিভাগে ১৪০৬ একর এবং সিলেট বিভাগে ৫১৬২ একর ওয়াকফ সম্পত্তি ভূমিদস্যুদের দ্বারা বেদখল হয়ে আছে।

আবার ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয় নিবন্ধন করেনি এবং জানেই না এমন অনেক ওয়াকফ সম্পত্তি সারা দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বাংলাদেশের ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী সারা দেশে প্রায় ১,৩৯,৫২৬ একর অনিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে, যার দেখভাল সরকারি ওয়াকফ প্রশাসন করে না।

বর্তমানে ওয়াকফ প্রশাসনে নিবন্ধিত রয়েছে ৭০,৯৫৫ একর জমি। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব সম্পত্তি দেখভাল করার জন্য ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে রয়েছে মাত্র ১১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ঢাকার কার্যালয় ব্যতীত জেলা এমনকি বিভাগীয়ে পর্যায়েও ওয়াকফ প্রশাসনের কোন কার্যালয় নেই। যদি কোন ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেলে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের ঢাকা অফিসে এসে লিখিত অভিযোগ দাখিল করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ সম্পত্তির অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কোন ব্যবস্থা এই কার্যালয়ের নেই। বলাই বাহুল্য, খুব কম ব্যক্তিই এধরণের অভিযোগ দাখিল করেন এবং  অব্যবস্থাপনার এই সুযোগে প্রতিনিয়তই ভূমিদস্যুরা ওয়াকফ সম্পত্তি জবরদখল করে নিচ্ছে।

ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় ওয়াকফ প্রশাসন চরম অবহেলা এবং অসহায়ত্তের পরিচয় দিলেও এসব সম্পত্তি থেকে তাদের আয় কিন্তু কম না। প্রতিবছর প্রতিটি ওয়াকফ সম্পত্তির বার্ষিক আয় থেকে ৫ শতাংশ অর্থ ওয়াকফ প্রশাসন এসব সম্পত্তি দেখভাল করার ব্যয় হিসেবে কেটে নেয়। এভাবে ওয়াকফ প্রশাসন ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৫,৮৬,৬২,২৮৭ টাকা শুধুমাত্র ২১,৫৮৮ টি নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে আয় করেছে। কিন্তু প্রশাসন এই অর্থ কোন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে না। বরং এই অর্থ থেকে প্রশাসনের কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয় এবং বিভিন্ন খরচ যেমন মামলার খরচ, ঋণ শোধ এবং পরিচালন ব্যয় মেটানো হয়।

আবার ওয়াকফ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখলে ওয়াকফ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগ বহু পুরনো এবং সংশ্লিষ্ট মহলে সুবিদিত। এই চলমান দুর্নীতির অন্যতম কারণ হলো ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, সম্পত্তি পরিদর্শকের এবং মোতাওয়াল্লিদের কার্যক্রম যাচাই-বাছাই করার জন্য কোন পরিবীক্ষণ বিভাগ নেই। এর ফলে এই কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রমে জবাবদিহিতার জায়গাটি একেবারেই অনুপস্থিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত যেসব আইন প্রচলিত আছে এবং ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার জন্য যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান, তা উভয়েই একদমই অকার্যকর। বর্তমান আইন এবং প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয় ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো উপর কোন জরিপ পরিচালনা করতে পারে না, তালিকা করতে পারে না এবং নিবন্ধিত সম্পত্তিতে কোন নিরীক্ষা বা অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। পারিবারিক ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় ওয়াকফ প্রশাসকের কোন ভূমিকাই নেই। আবার ওয়াকফ প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে পুরোটাই আমলা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে, যাদের অনেকেরই ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ইসলামি আইন বিষয়ে কোন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নেই।

আবার, এসব সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে কোন শরিয়া বোর্ডও গঠন করা হয়নি, যদিও বেশিরভাগ ওয়াকফ সম্পত্তি ইসলাম ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজেই দান করা হয়েছে এবং এসব সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন ইসলামি শরিয়াতে আছে। এসব কারণে ওয়াকফ প্রশাসনের অধীনে কেউ নতুন করে আর সম্পত্তি ওয়াকফ হিসেবে করছে না। কার্যালয়টির নতুন ওয়াকফ সম্পত্তি নিবন্ধন কার্যকম কার্যত বন্ধ আছে এবং সম্পত্তি ওয়াকফ করার প্রবণতাও আজ বিলুপ্তির পথে।

তবে বাংলাদেশ সরকারের ওয়াকফ প্রশাসন যেখানে ক্রমাগতভাবে তাদের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, সেখানে কিছু ওয়াকফ উদ্যোগ এখনো তাদের মহতী কার্যক্রম স্বচ্ছতার সাথে চালিয়ে যাচ্ছে। এমনই একটি উদ্যোগ হলো ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি এডুকেশনাল ওয়াকফ কর্তৃক পরিচালিত আইডিবি ভবন এবং ভবনে অবস্থিত কম্পিউটার বাজার, যা একটি ওয়াকফ সম্পত্তি। এই সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ, যার পরিমাণ প্রায় বার্ষিক ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার, ব্যয় করা হয় কারিগরি প্রশিক্ষণে এবং তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানে।

এই ওয়াকফ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ সরকারের ৩ জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি মোতাওয়াল্লি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির তত্বাবধানে এই ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ৬টি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যেমন- যেসব শিক্ষার্থী কম্পিউটার সায়েন্স-এর বাইরে অন্য কোন সাধারণ বিষয়ে পড়াশোনা করেছে, তাদের মধ্যে কম্পিউটার দক্ষতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই ওয়াকফ এস্টেট তাদের জন্য এক বছরের একটি সম্পূর্ণ অবৈতনিক কম্পিউটার প্রোগ্রামিং কোর্স চলমান রেখেছে। ২০০৩ সাল থেকে পরিচালিত এই কোর্সে অংশগ্রহণ করে ১১,০০০ এরও বেশি দক্ষ কম্পিউটার প্রোগ্রামার তৈরি হয়েছে, যাদের মধ্যে ৯২ শতাংশই সন্তোষজনকভাবে কর্মসংস্থানে যুক্ত রয়েছেন। খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন মাইক্রোসফট, ওরাকল এই কোর্সটির মান যাচাই করেছে এবং এই কোর্স করে অনেকেই এধরনের বিখ্যাত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।

আবার এই ওয়াকফ সম্পত্তির উদ্যোগে পরিচালিত যে কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম চলমান আছে, তা ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০০ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ট্রেডে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করছে। এই কার্যক্রমের আওতায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়ার খরচ ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে বহন করা হয় এবং শিক্ষার্থীরা মাসিক ৫০০ টাকা হারে একটি ভাতাও পায়। এছাড়া এই ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান ৬টি কারিগরি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা ইসলামি বিষয়ে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতাও অর্জন করছে। মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে। এসব প্রতিষ্ঠান এবং কোর্স সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীরা দেশি-বিদেশি ১০২টি সংগঠনে নিয়মিতভাবে চাকুরি পাচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাও ওয়াকফ উদ্যোগকে আরো কার্যকর করতে উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা উদ্যোগ নিয়ে ‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ নামক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, যারা যাকাতের অর্থ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা দিয়ে মানবজীবনের টেকসই উন্নয়ন অর্জন করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

যাকাতের পাশাপাশি তারা ওয়াকফ হিসেবে প্রদান করা অর্থও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রমে ব্যয় করছে। ‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা এবং রহিম আফরোজ শিল্পগ্রুপের পরিচালক নিয়াজ রহিম এক সাক্ষাতকারে বলেন,

“ওয়াকফ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার কোন বিকল্প নেই। আমরা আমাদের ফান্ড ব্যবস্থাপনায় ৩ স্তরে নিরীক্ষা (অডিট) কার্যক্রম পরিচালনা করি। এগুলো হলো অভ্যন্তরীণ অডিট, শরিয়া অডিট এবং অর্থ বিভাগের অডিট। এছাড়াও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আমরা এসব অডিট পরিচালনা করি, যেন স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ না থাকে। আমি মনে করি ওয়াকফ এবং যাকাতের অর্থ যদি স্বচ্ছতার সাথে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তাহলে এই অর্থ থেকে আমাদের দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার অভাবনীয় উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব। ‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ কর্তৃক পরিচালিত প্রকল্পে আমরা এমনটিই দেখেছি”।

তিনি আরো বলেন,

“একটা সময় ভূ-সম্পত্তি ওয়াকফ করার প্রবণতাই বেশি ছিল। বর্তমানে নগদ অর্থ ওয়াকফ করাকেও আমরা উৎসাহিত করছি যেগুলো শরিয়া মোতাবেক পরিচালিত ব্যাংকে রেখে একটি বৃহৎ ওয়াকফ ফান্ড গঠন করা সম্ভব এবং তা থেকে বৃহৎ আকারে জনকল্যাণমূলক কাজ করা সম্ভব। এভাবে জনকল্যাণ ও সমাজসেবামূলক কাজের ব্যয়ভার সরকারের কোষাগার থেকে অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব”।

যেখানে সরকারি ওয়াকফ প্রশাসনের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় আমরা মুসলিম ঐতিহ্যের এই অবিচ্ছেদ্য অংশ পুরোপুরি হারাতে বসেছি, তখন খুব ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও কিছু উদ্যোগ এখনো ওয়াকফ-এর ভবিষ্যত নিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছে। যদি ওয়াকফ এর সংস্কৃতিকে আমরা সম্পদের স্বচ্ছ, শরিয়াভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবার জনপ্রিয় করে তুলতে পারি, তাহলে তা আমাদের সমাজ ও অর্থনীতি গঠনে আবারো অসামান্য ভূমিকা পালন করতে পারবে।